আমরা প্রতিদিন নানা রকম শব্দ শুনি — মানুষের কথা, গাড়ির হর্ন, পাখির ডাক, বৃষ্টির শব্দ কিংবা বাতাসের মৃদু সোঁ সোঁ আওয়াজ। কিন্তু তুমি কি কখনও ভেবেছো, যদি আমরা পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে চলে যাই, সেখানে কি শব্দ শোনা যাবে? যদি কেউ মহাকাশে চিৎকার করে, আরেকজন কি সেটা শুনতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানভিত্তিক, আর উত্তরটা অনেকটা অবাক করার মতো — না, মহাকাশে কোনো শব্দ শোনা যায় না। চল ধাপে ধাপে বুঝে নেওয়া যাক, কেন এমনটা হয়।
শব্দ কীভাবে কাজ করে?
প্রথমে জানতে হবে, শব্দ আসলে কী। শব্দ হলো কম্পন (vibration), যা কোনো মাধ্যমের (যেমন বাতাস, পানি বা ধাতু) কণার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
যখন তুমি কথা বলো, তখন তোমার গলার স্বরযন্ত্র (vocal cords) কম্পন তৈরি করে। এই কম্পন বাতাসের কণাগুলিকে নড়াচড়া করায়, আর এই তরঙ্গ তোমার কণ্ঠস্বরকে অন্যের কানে পৌঁছে দেয়।
অর্থাৎ, শব্দ শোনার জন্য সবসময় একটি মাধ্যম (medium) প্রয়োজন — যেমন বাতাস, পানি, ধাতু বা অন্য কোনো পদার্থ। যদি সেই মাধ্যম না থাকে, তাহলে শব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে পারে না, ফলে শব্দও শোনা যায় না।
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন?
মহাকাশ হলো প্রায় সম্পূর্ণ শূন্যস্থান (vacuum)। এখানে প্রায় কোনো বায়ু নেই, অর্থাৎ বাতাসের কণাগুলো একে অপরের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। যেহেতু শব্দ তরঙ্গ ছড়াতে মাধ্যম দরকার, আর মহাকাশে সে মাধ্যম নেই, তাই শব্দও সেখানে চলাচল করতে পারে না।
তুমি যদি মহাকাশে গিয়ে চিৎকার করো, কেউ তোমাকে শুনতে পারবে না — এমনকি তোমার পাশে কেউ থাকলেও! কারণ তোমার কণ্ঠের কম্পন বাতাস না থাকায় তাদের কানে পৌঁছাতে পারবে না।
এই কারণেই মহাকাশকে বলা হয় “The Silent Space” — এক অসীম নীরবতা, যেখানে কোনো প্রাকৃতিক শব্দ নেই।
তাহলে কি মহাকাশ পুরোপুরি নিঃশব্দ?
না, পুরোপুরি নয়। বিজ্ঞানীরা মহাকাশের কিছু অঞ্চলে এমন কিছু জায়গা খুঁজে পেয়েছেন যেখানে গ্যাস, ধূলিকণা বা প্লাজমা (ionized gas) ভরা থাকে। এই অঞ্চলে কণার ঘনত্ব কিছুটা বেশি, ফলে সেখানে কম্পন ঘটতে পারে।
যদিও এই কম্পন মানুষের কানে শোনা যায় না, বিজ্ঞানীরা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে তা শনাক্ত করতে পারেন। যেমন, NASA অনেক সময় গ্যালাক্সি বা ব্ল্যাকহোলের আশেপাশের তরঙ্গগুলোকে “sound data” হিসেবে রেকর্ড করে এবং পরে সেগুলোকে “audible sound”-এ রূপান্তরিত করে। তুমি হয়তো শুনেছো—“The Sound of a Black Hole”—যা আসলে রেডিও তরঙ্গের ব্যাখ্যা, বাস্তব শব্দ নয়।
মহাকাশচারীরা কীভাবে কথা বলে?
এখন তোমার মনে হতে পারে — যদি মহাকাশে শব্দ না ছড়ায়, তাহলে মহাকাশচারীরা কীভাবে একে অপরের সাথে কথা বলে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রযুক্তিতে। মহাকাশচারীদের স্পেসস্যুটে থাকে মাইক্রোফোন, রিসিভার, ও রেডিও ট্রান্সমিটার। তারা যখন কথা বলেন, তাদের কণ্ঠ মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে এবং তা বৈদ্যুতিক সংকেত (electrical signal) এ রূপান্তরিত হয়। তারপর সেই সংকেত রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে অন্য মহাকাশচারী বা মহাকাশযানে পাঠানো হয়।
রেডিও তরঙ্গ শব্দ তরঙ্গ নয় — এটি তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ (electromagnetic wave), যা বাতাস ছাড়াও চলতে পারে। এই কারণেই মহাকাশচারীরা সহজে যোগাযোগ করতে পারেন, যদিও মহাকাশ নিজে নিঃশব্দ।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে মহাকাশের ‘শব্দ’ শোনেন?
বিজ্ঞানীরা সরাসরি কান দিয়ে কিছু শুনতে পান না, কিন্তু তারা বিভিন্ন স্যাটেলাইট ও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে radio waves, plasma waves ইত্যাদি শনাক্ত করেন। তারপর সেই ডেটাকে কম্পিউটার প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে শ্রাব্য শব্দে (audible sound) রূপান্তর করেন, যাতে আমরা তা শুনতে পারি।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২2 সালে NASA ব্ল্যাক হোলের কাছ থেকে সংগৃহীত ডেটাকে রূপান্তর করে এক ধরনের “মহাকাশের ভয়ানক আওয়াজ”-এর মতো শোনার অভিজ্ঞতা তৈরি করে। তবে সেটি আসল শব্দ নয়, বরং তড়িৎ তরঙ্গের অনুবাদ।
তুলনা: পৃথিবী বনাম মহাকাশ
| বিষয় | পৃথিবী | মহাকাশ |
|---|---|---|
| বাতাস আছে? | আছে | নেই (প্রায়) |
| শব্দ ছড়াতে পারে? | পারে | পারে না |
| মাধ্যম | বাতাস, পানি | শূন্যস্থান |
| শব্দ শোনা যায়? | হ্যাঁ | না |
| যোগাযোগের মাধ্যম | সরাসরি কণ্ঠ | রেডিও তরঙ্গ |
সারসংক্ষেপ
- শব্দ শোনার জন্য প্রয়োজন একটি মাধ্যম, যেমন বাতাস বা পানি।
- মহাকাশে বাতাস নেই, তাই শব্দ তরঙ্গ ছড়াতে পারে না।
- মহাকাশের বেশিরভাগ অঞ্চল নিঃশব্দ।
- কিছু গ্যাস বা প্লাজমা এলাকায় কণার কম্পন ঘটে, কিন্তু তা মানুষের কানে শোনা যায় না।
- মহাকাশচারীরা রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন।
শেষ কথা
মহাকাশ এক রহস্যময় ও নিঃশব্দ জগৎ। সেখানে শব্দের জন্য কোনো বাতাস নেই, কিন্তু সেখানে চলছে কোটি কোটি ঘটনার সংঘর্ষ—তারা বিস্ফোরণ, ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণি, গ্যালাক্সির সংঘর্ষ—সবই এমন এক নীরব নাটক, যা আমরা শুনতে পাই না, কেবল অনুভব করতে পারি।
মহাকাশের এই নীরবতাই তাকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়, আরও রহস্যময়, আর মানুষের কল্পনার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
ভিডিওটি দেখেছেন তো?
এই লেখায় যে বিস্তারিত তথ্যগুলো পেয়েছেন, সেগুলোর একটি ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা দেখতে চাইলে আমার ইউটিউব ভিডিওটি দেখুন।
